মেন্যু
songshoibadi

সংশয়বাদী

পৃষ্ঠা : 266, কভার : পেপার ব্যাক, সংস্করণ : ১ম
ড্যানিয়েল হাক্বিকাতযু। হালের একজন দা'ঈ ইলাল্লাহ। দীর্ঘদিন ধরেই বক্তব্য আর লেখালেখির মাধ্যমে লিবারেলিসম, সেক্যুলারিসম, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, নারীবাদ সহ বিভিন্ন মতবাদগুলোর পেছনের ধারণা ও প্রস্তাবনাগুলোর ব্যবচ্ছেদ তিনি করে আসছেন। "সংশয়বাদী" বইটিতে নাস্তিকতা,... আরো পড়ুন
পরিমাণ

260 

পছন্দের তালিকায় যুক্ত করুন
পছন্দের তালিকায় যুক্ত করুন

12 রিভিউ এবং রেটিং - সংশয়বাদী

4.7
Based on 12 reviews
 আপনার রিভিউটি লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

  1. 5 out of 5

    মুহাম্মদ রুবেল মিয়া:

    সংশয়বাদী, শুনেই অনেকে হয়তো ভাবছেন স্রষ্টায় অবিশ্বাসী কাউকে বুঝানো হচ্ছে। কিন্তু না, এখানে স্রষ্টায় অবিশ্বাস করে এমন কাউকে বুঝানো হয়নি! বরং ওই সকল মুসলমানকে বুঝানো হয়েছে, যারা পাশ্চাত্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন এবং সেই সংশয়ের পক্ষে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। বর্তমানে নাস্তিক্যবাদ, পাশ্চাত্যবাদ মোকাবেলার কৈফিয়তমূলক যে ট্রেন্ড চালু হয়েছে “সংশয়বাদী” বইয়ের লেখক সে দিকে চালিত হননি। বরং তিনি পাশ্চাত্যের বিশ্বাস, জীবনবোধ, কালচার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। শুধু কি প্রশ্ন তুলেই ক্ষান্ত দিয়েছেন? না, সেই সাথে সংশয়ের পক্ষে দলিল-প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন। এজন্যই বইয়ের নাম রাখা হয়েছে “সংশয়বাদী”।

    বইয়ের আলোচ্যবিষয় :
    বইটি মূলত ড্যানিয়েল হাকিকাতজুর বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে রচিত কিছু আর্টিকেলের সমষ্টি। যা অনুবাদ করেছেন সময়ের আলোচিত ও আলোকিত মুখ আসিফ আদনান। ইসলাম ও বাস্তবতার আতশি কাঁচের নিচে ফেলে উনারা পাশ্চাত্যকে বিচার করেছেন। পাশ্চাত্যের মতবাদগুলোর স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। বর্তমান বিশ্বের মুসলিম যুবক-যুবতিদের দেখাতে চেয়েছেন যেই পাশ্চাত্যকে তোমরা অনুসরণ করছো, পাশ্চাত্যের যেসকল মতবাদ নিয়ে লম্ফঝম্প করছো এগুলোর আসল রূপ এবং বাস্তবতা দেখে নাও। বইটি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এ যুগে মুসলিম যুবক-যুবতিদের পাশ্চাত্যের ছোবল থেকে রক্ষা করতে বদ্ধ পরিকর।

    বিশ্লেষণ :
    ইদানীং পাশ্চাত্য এবং পাশ্চাত্যের তৈরি করা মতবাদগুলোর বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। এই বিপ্লবের পিছনে সবচেয়ে বড়ো অবদান দায়ী এবং লেখকদের। যদিও তাদের আলোচনাটা কৈফিয়তমূলকই হয়ে থাকে। কিন্তু আত্মসম্ভ্রমবোধসম্পন্ন মুসলিমরা এতেই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ড্যানিয়েল হাকিকাতজু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি কৈফিয়তমূলক নয়, বরং আক্রমণামক ভঙ্গিতে পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্যের তৈরি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুধীতা করেছেন। শুধু তা-ই নয়। অন্যান্য লেখক এবং দায়ীরা আলোচনা করতে গিয়ে আলোচনার এতোটাই গভীরে প্রবেশ করেন যে, সাধারণ পাঠকরা আলোচনা ধরতে না পেরে খেই হারিয়ে ফেলেন। হাকিকাতজু এখানে ব্যতিক্রম। তিনি আলোচনাকে যথাসম্ভব বোধগম্যতার মধ্যে রেখেই পাশ্চাত্যকে বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি তাঁর আলোচনা ছিলো সরল এবং শ্রুতিমধুর। ফলে সাধারণ পাঠকদের জন্য বইয়ের আলোচনা বুঝা সহজবোধ্য হয়েছে।
    সেই সাথে অনুবাদক বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কিত ফুটনোট উপস্থাপন করেছেন, কিছু অপ্রয়োজনীয় আলোচনা বাদ দিয়েছেন এবং বিষয়বস্তুর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কিছু আলোচনা যুক্ত করেছেন, যেনো পাঠকের জন্য আলোচনা বুঝা সহজ হয়।
    আরো একটি বিষয় যা না বললেই নয়। বইটি যেহেতু লেখকের বিভিন্ন সময়ে লিখিত প্রবন্ধ সংকলন, তাই এক আলোচনার সাথে অন্য আলোচনার কোনো যোগসূত্র নেই। ফলে কোনো পাঠক বইয়ের যেকোনো একটি পাঠ নিয়ে পড়তে বসে যেতে পারেন। এতে আলোচনা বুঝতে আপনার কোনো সমস্যা হবে না।

    প্রয়োজনীয়তা :
    বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকিয়ে বইটিকে খুবই সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ বলাই যায়। একসময় বলা হতো বৃটিশদের ভূমিতে সূর্য কখনো ডুবে না। এর দ্বারা তাদের আগ্রাসনের ব্যপকতা তুলে ধরা হতো। সময়ের পরিবর্তন ঘটে। একসময় আগ্রাসনকারী উপনিবেশবাদীরা ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু রেখে যায় তাদের ধ্যান-ধারণা আর মতবাদ। বর্তমান পৃথিবী সরাসরি তাদের আগ্রাসনের শিকার না হলেও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন কিন্তু চলমান আছে। তাদের প্রতিষ্ঠিত মতবাদ ও তাদের সংস্কৃতির দখলদারিত্বের মাধ্যমে। আরো একটি কারণ অবশ্য আছে, তা হলো ইসলাম সম্পর্কে মুসলিমদের অজ্ঞানতা আর উদাসীনতা।
    পশ্চিমারা তাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি কার্যকর রেখেছে তাদের বিভাজন নীতি আর মতবাদগুলোর মাধ্যমে। তাঁরা মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের নামে মুসলিমদের মধ্যে বিভিন্ন দল-উপদলের সৃষ্টি করে দিয়েছে, যারা নিজেদের মধ্যেই মারামারি, দলাদলি,কথা-কাটাকাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে তাঁরা তাদের মূল দুশমনকে চিনতে পারে না। তেমনি আরো একটা বড়ো অংশ তাদের প্রতিষ্ঠিত মতবাদগুলো প্রচার ও প্রসারে কাজ করে। কিন্তু এগুলো কতোটা ইসলাম সম্মত সে সম্পর্কে তাদের কারো জানা নেই।

    লেখক হাকিকাতজু “সংশয়বাদী” বইয়ে সেগুলোরই আলোচনা করেছেন। ইসলাম এবং বাস্তবতার আলোকে পাশ্চাত্য ও পাশ্চাত্যের প্রতিষ্ঠিত এসব মতবাদের অসারতা তুলে ধরেছেন। যেনো মুসলিমরা এগুলো থেকে বেঁচে থাকে। এগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক এবং সাংস্কৃতিক উভয় দিক থেকে ব্যবস্থা নেয়। সর্বোপরি আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে অনুপ্রাণিত হয়।

    11 out of 11 people found this helpful. Was this review helpful to you?
    Yes
    No
  2. 5 out of 5

    Arafat Shaheen:

    আপনি কি নিজেকে একজন ‘সংশয়বাদী’ মানুষ বলে মনে করেন?
    প্রশ্ন শুনে বিশ্বাসীদের আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই। আবার এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ারও প্রয়োজন নেই। পুরো লেখাটি পড়েই তারপর না-হয় সিদ্ধান্ত নেবেন! তারচেয়ে বরং একটি ঘটনা আগে জেনে আসা যাক।


    ২০১৯ সালের মার্চে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের নিয়ে বেশ বড় পরিসরে লেখক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে আয়োজক কমিটির সঙ্গে কাজ করার সুবাদে দুই বাংলার অনেক বড়ো বড়ো লেখককে একেবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। সে সময় এমন একটি ঘটনার স্বাক্ষী হই, যাতে নিজেকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবনাচিন্তা করতে বাধ্য হই। একদিন আমি একজন লেখককে (তিনি ডক্টরেট ডিগ্রিধারী এবং পশ্চিম বাংলার একটি কলেজের অধ্যাপক। সবচেয়ে বড়ো কথা—নাম দেখে তাকে একজন মুসলিম হিসেবেই আমি মনে করেছি) সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর না দিয়ে হুট করেই বলে বসলেন, এই আরবির জন্যই কি তোমরা ভাষা আন্দোলন করেছিলে? এই কথাটি বাংলায় বলা যায় না?

    সালামের জবাবের প্রতীক্ষায় থেকে একজন মুসলিমের কাছ থেকে এমন কথার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ফলে কী জবাব দেবো কিছুই ভেবে বের করতে পারলাম না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তবে ভেতরে ভেতরে আমার মুসলিম সত্তা ফুঁসে উঠছিল ঠিকই। মহান আল্লাহ যে সিস্টেম সারা দুনিয়ার মুসলিমদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তুমি তার বিরোধিতা করার কে! বিষয়টি নিয়ে পরে অনেক ভেবেছি। এই ভাবনা থেকেই পরবর্তী সময়ে আমি ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেছি; নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে আসার জন্য আকুলতা অনুভব করেছি ব্যাপকভাবে।


    একটা সময় অমুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমান সময়ে এসে অনেক মুসলিমই নিজের পরিচয় নিয়ে একধরনের হীনমন্যতায় ভুগে থাকেন। তেমনই একজন মানুষ হলেন আমার আলোচিত ওই ব্যক্তি। শুধু তিনি একা নন—এই সমাজে নিজেকে ‘স্যেকুলার’ হিসেবে পরিচয় দেয়া অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক ধারণা লালন করে থাকে। তাদের মতে—ইসলাম হলো সেকেলে চিন্তাধারা। পনেরো শত বছর আগের চিন্তাধারা এখন কে মেনে নেবে! এ সমস্ত প্রশ্ন কিন্তু আজ মুসলিম সোসাইটির ভেতর থেকেই আসছে। সুতরাং এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিয়ে যদি অচিরেই তাদের চিন্তার উৎসসমূহ বন্ধ করা না যায়, তাহলে তা মহামারির মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। আর পশ্চিমাদের চিন্তার লেজুড়বৃত্তি করা এসব ‘চিন্তানায়কদের’ যদি যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের চিন্তার অসারতা এবং ইসলামের গৌরবগাঁথা বুঝিয়ে দেয়া না যায়, তাহলে সংকট উত্তরোত্তর বেড়ে যাবে বলেই মনে করি।

    পশ্চিমা মুলুকে জন্ম নেয়া ও সে সমাজকে ভেতর থেকে দেখার ফলে ড্যানিয়েল হাকিকাতযু তার সমস্যাগুলোও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার ফলে সে বিষয়েও তার জানাশোনা তার দশজনের চেয়ে কম নয়। ফলে তিনি যখন পশ্চিমাদের ভণ্ডামি ও মিথ্যাচার নিয়ে কথা বলবেন, তখন তা অবশ্যই মনোযোগ সহকারে শোনার দাবি রাখে।


    ড্যানিয়েল হাকিকাতযু মূলত একজন দ্বায়ী। তিনি বক্তৃতা এবং লেখনীর মাধ্যমে বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সমস্যাসমূহ যেমন—নাস্তিকতা, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীবাদ, হিজাব, বিজ্ঞানবাদ, লিবারেলিসম, নৈতিকতা ও প্রগতিবাদ, মডার্নিটি, সংস্কারপন্থী ও মডার্নিস্ট মুসলিম, যৌনতা ও যিনা নিয়ে বেশ বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা করেছেন। এখানে আমাদের একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে—এ সমস্ত আলোচনা কোনো ভাসা ভাসা জ্ঞানের ভিত্তিতে নয়, বরং ইসলামের মৌলিক গ্রন্থসমূহ এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের গ্রন্থ ঘেটে তবেই লেখা হয়েছে। ‘সংশয়বাদী’ নামের অসাধারণ এই বইটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন সাড়া জাগানো ‘চিন্তাপরাধ’ বইয়ের লেখক আসিফ আদনান। সুতরাং এটি যে কোনো কাঁচা হাতের কাজ নয় তা সহজেই অনুমেয়।

    এবার আসুন দেখা নেয়া যাক বইয়ের আলোচ্য বিষয় কী কী।


    নাস্তিকতা:
    মানব সভ্যতার জন্য এই রোগ বহু পুরনো। তবে নাস্তিকতা কখনোই মানুষের ওপর এরকম সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে হাজির হতে পারেনি যেমনটা হয়েছে ‘ফরাসি বিপ্লব’ পরবর্তী সময়ে। তখনই রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করে দিয়ে নাস্তিকতার সয়লাব ঘটানো হয়েছে। ইউরোপীয়রা ‘এনলাইটমেন্ট’-এর নাম নিয়ে মূলত অন্ধকারের দিকেই পতঙ্গের মতো ছুটে চলেছে। তারা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর রয়েছে—যেখানে সৃষ্টিকর্তা বলে কিছু থাকবে না। নাস্তিকরা মনে করে তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু প্রকৃত কথা হলো—এই অবিশ্বাসও তাদের একপ্রকার বিশ্বাস; যাকে টিকিয়ে রাখতে তারা যেকোনো ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নিতে পিছপা হয় না। নাস্তিকতার মুখোশ উন্মোচন এবং তা থেকে মুসলিমদের ঈমান হেফাজত করার জন্য সাতটি প্রবন্ধ রয়েছে; যা একজন বিশ্বাসীর বিশ্বাসকে আরও পোক্ত করে তুলবে।

    গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা:
    এই দুটি শব্দ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আজকের পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রই নিজেদের অতি প্রগতিশীল হিসেবে প্রমাণ করার জন্য পশ্চিমাদের বানানো গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে। মুসলিম জাতির গর্ব করার মতো অতীত থাকার পরও তাদের এই সিস্টেম মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। উসমানী সাম্রাজ্যের পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয় মুসলিম ভূখণ্ডে, তার সুযোগ নিয়েই পশ্চিমা শক্তি চেপে বসে আমাদের ওপর।
    স্যেকুলার রাষ্ট্র যতই নিজেদের গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ বলে প্রচার করুক না কেন, তারা কখনোই নিজেদের বানানো সিস্টেমের বাইরে কিছু সহ্য করে না। নিজেদের সুশীল হিসেবে পরিচয় দেয়া এসব রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু যেন ইসলাম এবং মুসলিম জাতি! বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার দিকে তাকালেই এর সত্যতা উপলব্ধি করা যায়। এই বিষয়টি নিয়েও দারুণ আলোচনা রয়েছে।

    সাম্য, মুক্তি, স্বাধীনতা:
    এই স্লোগান দিয়েই ইউরোপ থেকে ধর্ম নামক বিষয়টিকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। তারা যে সাম্যের কথা বলে, তা কখনোই নিজেদের সীমানা অতিক্রম করতে পারেনি। তারা যে মুক্তি এবং স্বাধীনতার কথা বলে, তা মূলত ছিল শয়তানের দাসত্বে বন্দী হওয়া। পৃথিবীর সকল দেশে তারা তাদের এই স্লোগানকে ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শয়তানি চক্রান্তকেই শুধু বাস্তবায়ন করে চলেছে। অথচ অনেক অবুঝ মুসলিম তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে দিগভ্রান্ত হচ্ছে। ইসলাম কখনোই অবাধ স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় না। কিন্তু পশ্চিমা শয়তানেরা ব্যক্তিস্বাধীনতার নাম করে হরহামেশাই আল্লাহর দেয়া সীমানা লঙ্ঘন করছে। ফলে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে বিপর্যয়। কীভাবে একজন মানুষ শয়তানি এই মতবাদ থেকে বের হয়ে আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমানার মধ্যে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে পারে, তা এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়।

    নারীবাদ:
    পশ্চিমারা যে মতবাদের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে পেরেছে তা হলো নারীবাদ। সাধারণ অবস্থায় এই মতবাদে তেমন কোনো ঘৃণা উদ্রেককারী বিষয় দেখা না গেলেও বাস্তবে এই মতবাদ মুসলিম জনপদগুলোতে বানের জলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নারীদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে নামে প্রচারিত হলেও, এই মতবাদ মূলত শেষ পর্যন্ত একজন নারীকে চরমভাবে ধর্মবিদ্বেষী করে তোলে। কারণ, একজন নারীবাদী মনে করে, ধর্ম তার স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে। লেখক নারীবাদ বিষয়ক লেখাগুলোতে দেখিয়েছেন একজন মুসলিম নারী কীভাবে চারটি পর্যায় অতিক্রম করে একসময় চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। নারীবাদ বিষয়ে এমন গঠনমূলক লেখা এর আগে আমি পড়িনি। পুরো বইয়ের মধ্যে এই অধ্যায়টি আমার কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ মনে হয়েছে।

    হিজাব:
    হিজাব বা পর্দা মুসলিম নারীদের জন্য আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি। কেউ যদি পর্দাকে অস্বীকার করে কিংবা পর্দা নিয়ে কোনো মুসলিম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তাহলে তার ঈমান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। অথচ পশ্চিমা পণ্ডিতদের পাল্লায় পড়ে আজকাল মুসলিম সোসাইটির নারীরা পর্দা বিষয়ে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করা শুরু করেছে। এমনকি অনেকেই প্রকাশ্যে পর্দার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেছে। একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে—পশ্চিমারা যতই ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলুক না কেন, যে মুসলিম নারী আল্লাহর ইচ্ছা মেনে পর্দা করেন, তাকে তারা সেকেলে বলে তাচ্ছিল্য করে। কী ডাবলস্ট্যান্ডার্ড! সুতরাং পর্দা নিয়ে নাস্তিকরা যে-সকল প্রশ্ন করে থাকে, তার যৌক্তিক জবাব এই অধ্যায়ে পাওয়া যাবে।

    বিজ্ঞানবাদ:
    বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে আজকাল কিছু পণ্ডিত ইসলমাকে বাতিল ঘোষণা করতে চায়। অনেক মুসলিম এজন্য বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাদের সাথে আপোষ করতে চায়। কিন্তু একথা কিছুতেই ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে—বিজ্ঞান ক্ষণে ক্ষণে তার রং পাল্টায়। আজকের প্রতিষ্ঠিত থিওরি আগামীকাল বাতিল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর বাণী অকাট্য; তাতে কোনো ভুল কিংবা পরিবর্তনের সামান্যতম সুযোগ নেই। এই বিষয়গুলো লেখক দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    লিবারেলিসম, নৈতিকতা ও প্রগতিবাদ:
    পশ্চিমা দর্শনে বলা হচ্ছে, আমার কাজে যদি কারো ক্ষতি না হয়, তাহলে তা আমি সানন্দে করতে পারি। ফলে তারা নিজস্ব চিন্তায় নৈতিকতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিয়েছে। নিজেদের সর্বশ্রেষ্ঠ ভেবে বাকি দুনিয়ার মানুষকে নিচু শ্রেণি মনে করছে তারা। ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পৃথিবীর যে-কোনো দেশে হামলা করার বৈধতা পেয়ে গেছে যেন! উন্নতি এবং প্রগতির নামে তারা এমন মতাদর্শ পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিয়েছে, যার বিষে একেবারে নীল হয়ে যাচ্ছে বাদবাকি দুনিয়া। এই সংকটকে মোকাবিলা করার পন্থা পাওয়া যাবে এই অধ্যায়দ্বয়ে।

    সংস্কারপন্থী ও মডার্নিস্ট মুসলিম:
    ইউরোপ-আমেরিকার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়ায় আজকাল অনেক মুসলিম ইসলামে সংস্কারের কথা বলা শুরু করেছে। তারা এমন সব বিষয় নিয়ে কথা বলছে, যেগুলো সংস্কার কিংবা সামান্য পরিবর্তন করা হলেও ইসলাম তার মূল থেকে বিচ্যূত হয়ে পড়বে। তাদের মতে—পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ইসলামকে বিচার করতে হবে। তারা যেটা ভালো বলবে সেটা ভালো, আর খারাপ বললে তা খারাপ। কিন্তু কখনো তারা এই প্রশ্ন নিজেকে করে না যে— আমাদের কাছে পবিত্র কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী থাকার পরও কেন আমরা অন্যের দারস্থ হবো? বর্তমান সময়ে ছড়িয়ে পড়া এই ভয়াবহ ফিতনা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রয়েছে বইয়ে।

    যৌনতা ও যিনা:
    পশ্চিমা জগত আজ অবাধ যৌনাচারে আক্রান্ত। এই বিষয়ে তারা যেন একেবারে লাগানহীন হয়ে পড়েছে! ফলে তাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে অন্তহীন সমস্যা। ইসলামের সুনির্দিষ্ট যৌনতা বিষয়ক শিক্ষা থাকলেও আজকাল সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌনশিক্ষার নামে বেহায়াপনার বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই সয়লাব রুখতে হলে সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

    সংশয়বাদী:
    এই অধ্যায়ের নামেই বইটির নামকরণ। সুতরাং এটি যে এই বইয়ের সারনির্যাস তা সহজেই অনুমেয়। আজ পশ্চিমা সভ্যতা ইসলামি জীবনব্যবস্থার ওপর আক্রমণাত্মক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে; আর আমরা—মুসলিম জনপদ শুধু তাদের সে আক্রমণ ঠেকাতেই ব্যস্ত রয়েছি। কিন্তু এভাবে তো বেশিদিন চলা যাবে না। তাহলে উপায় কী?
    হ্যাঁ, উপায় অবশ্যই আছে। আর সেটা হলো—রক্ষণশীলতার খোলস ছুঁড়ে ফেলে আমাদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। তারা যে সকল মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেগুলোর বিরুদ্ধে সংশয় প্রকাশ করতে হবে। তাদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হবে—কেন তোমাদের এই মতবাদ শ্রেষ্ঠ? তাদের ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে বিশ্ববাসীর সামনে। তারা যেমন ইসলাম বিষয়ে সংশয়বাদী, তেমনি আমাদেরও পশ্চিমা দর্শনের বিরুদ্ধে খাঁটি সংশয়বাদী হয়ে উঠতে হবে।


    এতক্ষণ আমরা বইয়ের আলোচ্য বিষয়গুলো তুলে ধরলাম। এখন অনুবাদ নিয়ে কয়েকটি কথা বলছি। বইটির অনুবাদ করেছেন সুলেখক আসিফ আদনান। তার জানাশোনার পরিধি উপলব্ধি করেছি ‘চিন্তাপরাধ’ পড়তে গিয়ে। এবার তাকে অনুবাদক হিসেবেও চিনে নেয়ার সুযোগ হলো। অনেকেই অভিযোগ করেছেন—অনুবাদ কঠিন হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে একদমই সেরকম মনে হয়নি। বরং এরকম ভারি বিষয়ের অনুবাদ যেমন ধীরস্থির হওয়া প্রয়োজন সেরকমই হয়েছে। তবে বইটি পড়া সময় অবশ্যই কিছু পরিভাষা যেমন—মডার্নিটি, মেটাফিযিক্স, সেক্যুলারিসম, লিবারেলিসম, নায়ালিসম এরকম আরও কিছু শব্দের সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে পরিচিত থাকতে হয়। তা নাহলে একটু কঠিন মনে হতেই পারে। এই বইটি পাঠকদের বহুদিন সংরক্ষণ করতে হবে নিঃসন্দেহে। তাই বইটি পেপারব্যাক না হয়ে হার্ডকাভার হলে ভালো হতে।

    অবশেষে বইটি সম্পর্কে এককথায় অনুবাদক আসিফ আদনানের ভাষায় বলছি, ‘ইসলাম ও আধুনিকতার ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের প্রকৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে দুঃখজনকভাবে আমাদের মধ্যে আজও অনেক বিভ্রান্তি কাজ করে। এখানে যে আদৌ কোনো দ্বন্দ্ব আছে সেটাই অনেকে বোঝেন না বা বুঝতে চান না। পশ্চিমা লিবারেল ক্রুসেইডের মোকাবিলার জন্য এই দুই ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং এই লড়াইয়ের উপযুক্ত কৌশল বেছে নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি আশা করি ‘সংশয়বাদী’ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে, বিইযনিল্লাহ।’


    এবার আমাকে বলুন—পুরো রিভিউটি পড়ে এখন কি নিজেকে একজন ‘সংশয়বাদী’ মানুষ বলে মনে হচ্ছে?

    6 out of 7 people found this helpful. Was this review helpful to you?
    Yes
    No
  3. 5 out of 5

    শারাফাত উল্যাহ ফুরক্বান:

    সত্যি বলতে এরকম বই এদেশে বিরল।
    যারা বাক্সের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে চান তাদের জন্য এটা বাংলা ভাষাতে এক অনন্য সংযোজন। চিন্তার ব্যাপক খোরাক জোগাবে এই বই,নাড়া দিবে আপনার চিন্তার জগতে।ইনশাআল্লাহ।
    ইসলাম সাথে অন্যান্য মতবাদের সাংঘর্ষিক দিকগুলো ও ইসলামের মৌলিকত্ব,অনন্যতা,যথার্থতা ও সার্বজনীনতা এই বইয়ে লিখক খুব যৌক্তিক বিশ্লেষণের আলোকে তুলে ধরেছেন।
    বইটি লিখেছেনঃ উস্তাদ ড্যানিয়েল হাকিকাতজুও।
    বঙ্গানুবাদ করেছেনঃ আসিফ আদনান ভাই।
    5 out of 5 people found this helpful. Was this review helpful to you?
    Yes
    No
  4. 5 out of 5

    Nashif Fuad Khan:

    Daniel er boi ta bhalo legeche. Very good read for anyone struggling with the modern ideologies.
    3 out of 3 people found this helpful. Was this review helpful to you?
    Yes
    No
  5. 5 out of 5

    kazi naimul:

    আমি শুধু এ কারণেই ৪ স্টার দিচ্ছি যে লেখক ইসলামের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে বইটি লিখেছেন এবং অনুবাদক প্রিয় আসিফ ভাই বইটি অনুবাদ করেছেন। আর লেখার মান ভালো ও প্রিন্টিং ভালো মানের হওয়ায় আরও ১ স্টার।
    5 out of 6 people found this helpful. Was this review helpful to you?
    Yes
    No